ভাড়া তো প্রতি বছরই বাড়াচ্ছেন, ভাড়াটেদের খোঁজ রাখছেন তো? |
বুধবার , ২১ নভেম্বর ২০১৮
  • প্রচ্ছদ » মতামত » ভাড়া তো প্রতি বছরই বাড়াচ্ছেন, ভাড়াটেদের খোঁজ রাখছেন তো?




ভাড়া তো প্রতি বছরই বাড়াচ্ছেন, ভাড়াটেদের খোঁজ রাখছেন তো?



নিউজ সময় : 27/07/2016


কল্যাণপুর পাঁচ নম্বর সড়কের জাহাজ বিল্ডিং। সঙ্গত কারনে্ই এই বাড়িটির নাম এখন মানুষের মুখে মুখে। এই বাড়িটিতেই একটি জঙ্গী আস্তানার খোঁজ পেয়ে পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়। অভিযানে নয় জন জঙ্গি নিহত হয়। এছাড়াও বাড়িটি থেকে আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, গ্রেনেড এবং বিস্ফোরক পাওয়া যায়। কিছুদিন আগেই আমরা এমন আরও একটি জঙ্গি আস্তানার খবর পাই। সেটি ছিল বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ই-ব্লকে ছয় নম্বর সড়কের তিন নম্বর টেনামেন্টের এ/৬ নম্বর ফ্ল্যাট। এটি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্যের ফ্ল্যাট। পুলিশ জানায়, গুলশানের ঘটনায় জঙ্গিদের চূড়ান্ত অপারেশন পরিকল্পনা, অস্ত্র ও বোমা রাখার নিরাপদ আস্তানা ছিল এই ফ্ল্যাটটি।opinion__121549

কল্যাণপুরের ওই জাহাজ বিল্ডিং এর কথাই বলুন আর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ওই ফ্ল্যাটটির কথাই বলুন না কেন, জঙ্গিরা যেসব এলাকায় আস্তানা গড়ে তুলছে, তার সবই জনবসতিপূর্ণ এলাকা। এমন নয় যে, তারা কোনো বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপে গিয়ে লুকিয়ে আছে। জঙ্গিরা আমাদের আশেপাশেই কারো না কারো বাসা ভাড়া নিয়ে বাস করছে। কিন্তু কয়জন বাড়িওয়ালা তার ভাড়াটিয়াদের খোঁজ খবর রাখছেন? ঢাকা শহরে এমন অসংখ্য বাড়ির মালিক আছেন যাদের ঢাকাতেই রয়েছে তিন/চারটি বা আরও একাধিক বাড়ি। এই সব বাড়িতে আবার ছোট, বড়, মাঝারি হরেক রকমে ফ্ল্যাট এমনভাবে বানানো হয়েছে যে একটি সাততলা বাড়িতেই হয়তো রয়েছে তিরিশটি ফ্ল্যাট। এমন একাধিক বাড়ির মালিকরা বেশিভাগ ক্ষেত্রেই ভাড়াটিয়াদের সাথে ব্যক্তিগত ভাবে পরিচিত নন। ভাড়াটিয়াদের কাছে বাসা ভাড়া সংগ্রহ সহ অন্যান্য তদারকির জন্যে তারা ক্ষেত্রবিশেষে লোক নিয়োগ দিয়ে থাকেন। অনেক বাড়িওয়ালাই আবার বিদেশে থাকেন, বাড়ি এবং ভাড়াটিয়াদের দেখাশোনা করেন হয়তো তাদের কোনো নিকটাত্মীয়। আর এভাবেই তারা বছরের পর বছর বাড়ি ভাড়া দিয়ে যাচ্ছেন।

সন্দেহাতীত ভাবে বলা যায়, এসব বাড়িওয়ালা আর কোনো বিষয়ে খেয়াল রাখুক আর না রাখুক মাস শেষে বাড়িভাড়াটা ঠিক মত আসলো কি না সেই খবরটি তারা ঠিক মতই রাখেন। ও হ্যাঁ, আরও বিষয় নিশ্চয়ই তারা খেয়াল রাখেন। সেটি হলো, বছর শেষে বাড়ি ভাড়াটা যে বাড়াতে হবে, সে বিষয়টিও তারা ভুলেন না কখনও। এছাড়া বাড়িতে কারা বসবাস করছে, ছাত্র নাকি চাকরিজীবী, না কোনো পরিবার, কয়জন বাড়িওয়ালা এসব খবর রাখেন আমার সন্দেহ আছে তা নিয়ে। বাড়িওয়ালাদের এমন উদাসীনতার কারনে যদি কোনো জঙ্গি এসে বাসাভাড়া নিয়ে আস্তানা গড়ে তোলে, তার দায় কে নেবে?

পুলিশ একটি/দুটি আস্তানার সন্ধান পেয়েছে আর কয়েকজন জঙ্গিকে গুলি করে মেরেছে বলে তো এমন নয় যে, দেশ জঙ্গিমুক্ত হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই আরও অনেক জঙ্গি কোনো না কোনো বাড়িওয়ালার বাসা ভাড়া নিয়ে আস্তানা গড়ে তুলেছে। আর ওই আস্তানায় বসে বসেই নিশ্চয় তারা ভবিষ্যতে কোথায়, কোন ক্যাফেতে হামলা করতে হবে তার ছক কাটছে। এখন বাড়ির মালিকরাই ভেবে দেখুন, আপনার বাড়িতে কে বাস করছে সেটা আপনি আগে খোঁজ নেবেন নাকি, পুলিশ এসে রাতভর অভিযান চালিয়ে আপনাকে বুঝিয়ে দিয়ে যাবে যে এতোদিন আপনি একদল জঙ্গিকে বাসা ভাড়া দিয়েছিলেন।

আমরা সবাই চাই দেশ জঙ্গিমুক্ত হোক। কিন্তু সেই চাওয়ার মধ্যে আন্তরিকতা কতটুকু? পুলিশ বাহিনীর ওপর আমরা খুব বেশি নির্ভরশীল। আমরা নিজেদের দ্বায়িত্বটা ঠিক মত পালন করি না, কিন্তু চাই পুলিশ একাই দেশকে জঙ্গিমুক্ত করুক। কল্যাণপুরে জাহাজ বিল্ডিয়ের জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ বাহিনী তাদের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে। এখন বাড়িওয়ালাদেরও উচিৎ নিজেদের দ্বায়িত্বটা ঠিক মত পালন করা। যদি আজ এই মুহূর্ত থেকে প্রতিটি বাড়ির বা ফ্ল্যাটের মালিক খোঁজ নেয়া শুরু করেন যে, তার ভাড়াটিয়ারা কোনো রকম জঙ্গি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কিনা, তাহলে নিশ্চয়ই পুলিশের কাজটা অনেক সহজ হয়। এসব জঙ্গিরা তো নিজেদের আস্তানায় বন্দুক, গুলি, গ্রেনেড, বিস্ফোরক, জিহাদি বই, কালো পোশাক, কালো পতাকা ও আরবি ভাষায় লেখা ব্যানার সহ অনেককিছুই রাখছে, সন্দেহজনক মনে হলেই পুলিশে খবর দিন।

মুদ্রার অন্যপিঠেও রয়েছে ভিন্ন গল্প। বাড়িওয়ালাদের একাংশ যেমন ভাড়াটিয়াদের খোঁজ খবর রাখার ব্যাপারে ভীষণ উদাসীন, বাড়িওয়ালাদের আরেকটি অংশ আবার এতোটাই সতর্ক যে তারা ব্যাচেলর শুনলেই বাসা ভাড়া দিতে চান না। আগে তো এমনিতেই ব্যাচেলরদের বাসা ভাড়া দিতে চা্ইতেন না বাড়িওয়ালারা। এখন যে হারে জঙ্গিরা বাসা ভাড়া নিয়ে আস্তানা গড়ে তুলছে, তাতে করে ব্যাচেলরদের সমস্যা আরও বেড়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যেমে ব্যাচেলররা বাসা ভাড়া পাওয়া নিয়ে নানা ধরণের সমস্যার কথা বলা শুরু করছেন। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছাত্রদের আবাসন সুবিধা দিতে না পারায়, ছাত্ররা বাধ্য হয় ভাড়া বাসায় থেকে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় মেয়েদের জন্য সরকারি বা বেসরকারি নানা ধরনের হোস্টেল থাকলেও, ছেলেদের জন্য এ ধরণের ব্যবস্থা খুবই অপ্রতুল। বেশিভাগ ক্ষেত্রেই একসঙ্গে বেশ কয়েকজন ছাত্র মিলে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে তারা। কিন্তু, এখন যদি বাড়িওয়ালারা ব্যাচেলরদের বাসা ভাড়া দেয়া বন্ধ করে দেয়, তাহলে ছাত্ররা যাবে কোথায়?

মাথা ব্যাথা সারানোর জন্য যেমন মাথা কেটে ফেলাই সমাধান নয়, তেমনি ব্যাচেলরদের বাসা ভাড়া দেয়া বন্ধ করলেই সমস্যা সমাধান হবে সেটা আশা করাও ঠিক নয়। আর তাছাড়া, এখন তো নারী জঙ্গিদেরও খবরাখবর পাওয়া যাচ্ছে পত্রিকায়। স্বামী-স্ত্রী সেজে এসে যদি কোনো জঙ্গি বাসা ভাড়া নেয়, তাহলে তা বুঝবেন কিভাবে? কাজেই মানুষের বৈবাহিক ব্যবস্থা বিবেচনায় রেখে বাসা ভাড়া দেয়াটা কোনো সমাধান নয়। সমস্যার সমাধান করতে চাইলে, ভাড়াটিয়াদের ব্যাপারে খোঁজ-খবর রাখতে হবে, তাদের গতিবিধির ওপর নজরদারি চালাতে হবে। ঢাকা শহরের বেশিভাগ বাসার গেটেই ইন্টারকম সিস্টেম নেই। কখন কার বাসায় কে আসলো বা গেলো, বেশিভাগ বাসার গেটেই সে সব তথ্যও সংরক্ষণ করা হয় না। গেটে নামমাত্র একজন পাহারাদার রাখা হয়, যাদেরকে বেশিভাগ সময়ই অন্য কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। যেসব বাড়িওয়ারা ভাড়াটিয়াদের দেখাশোনার জন্য লোক রেখেছেন, তাদের অবস্থাও একই রকম। তারা সারা মাসই ব্যস্ত থাকেন বাড়িওয়ালার অন্যান্য কাজে, শুধু মাস শেষে ভাড়াটিয়ার মুখোমুখি হন বাসাভাড়ার টাকা আদায় করার জন্য। কাজেই এইভাবে তো সমস্যার সমাধান করা যাবে না। যিনি ঢাকা শহরে একটি বাড়ি বানাতে পেরেছেন, তিনি নিশ্চয়ই ভাড়াটিয়াদের দেখাশোনার জন্য একজন সার্বক্ষণিক লোক বা গেটে দুই একজন পাহারাদার রাখারও সামর্থ্য রাখেন। এখন সময়, বাড়িওয়ালাদের সেই সামর্থ্যটাই দেখিয়ে দেয়ার। ভাড়াটিয়াদের ব্যাপারে চোখ-কান খোলা রাখুন, আপনার নিরপরাধ প্রতিবেশীদের সুরক্ষিত রাখুন। সর্বপরি, দেশকে জঙ্গিমুক্ত করুন।

রোকেয়া লিটা

সাংবাদিক

Loading...
loading...



Editor : Zakir Hossain,
Office : Jeddah,Kilo3,Old Makkah Road Behind Al Rajhi Bank
Email : [email protected]